প্রতিনিধি ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ , ৫:৪০:৪৩ অনলাইন সংস্করণ
কপোতাক্ষ টাইমস ডেক্সঃ
চোর পালালে যেমন বুদ্ধি বাড়ে, ঠিক তেমনই এখন শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলাকারীসহ পুরো চক্রকে বাগে আনতে বুদ্ধি ও তথ্যের যেন কোনো ঘাটতি নেই। যদিও চিহ্নিত শুটার ফয়সাল করিম মাসুদসহ সহযোগী মোটরসাইকেলচালক আলমগীরকে ধরতে পারেনি পুলিশ। তারা নির্বিঘ্নে ভারতে চলে যেতে পেরেছে।
অথচ তারা কীভাবে, কোন রুট দিয়ে, কাদের সহায়তায় দেশত্যাগ করেছে-এর সব তথ্যই এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের ভুটিয়াপাড়া সীমান্ত দিয়ে তাদের পার হওয়ার ব্যাপারে যে দুজন পাচারকারী সরাসরি যুক্ত ছিলেন, তাদেরও গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া ফয়সালের স্ত্রী, শ্যালক ও বান্ধবীকেও গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু আসল টার্গেট হাতছাড়া। বজ্র আটুনি ফসকা গেরো। সন্ত্রাসী শুটার ফয়সাল ও আলমগীর নির্বিঘ্নে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে গিয়ে সেলফি তুলছে। দেশের মধ্যে এভাবে সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে তারা সহজে দেশ ত্যাগ করে আশ্রয় নিতে পারবে বলে জানান দিচ্ছে। বিষয়টিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার চরম ব্যর্থতা বলে অভিহিত করেছেন বিশ্লেষক মহল ছাড়াও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. ওমর ফারুক যুগান্তরকে বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা জনমনে আতঙ্ক ও হতাশা তৈরি করবে। হামলাকারীরা পালিয়ে যাওয়ায় অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।’ তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘অপরাধীরা কত শক্তিশালী? সেটা কি রাষ্ট্র এবং সরকারের কাঠামোর ঊর্ধ্বে। যদি ঊর্ধ্বে না হয়, তাহলে গ্রেফতারের আওতায় আনা যাবে না কেন, অন্য দেশে চলে যাবে কেন?’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক যুগান্তরকে বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা দেখছি, হাদিকে রাজধানীতে হত্যাচেষ্টা করে সীমান্ত দিয়ে পালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এমনকি তারা সীমান্ত পার হয়ে সেলফি তুলে প্রকাশ করছে। আমরা জানি, আমাদের বর্ডার সুরক্ষিত। সীমান্তে নিরাপত্তার জন্য বিজিবিও আছে। এর বাইরে আছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এরপরও তারা কীভাবে চলে যায়? এ ধরনের অপরাধ করে তারা কীভাবে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে? এটি আমাদের হতাশ করেছে।’ তিনি মনে করেন, এ ধরনের পরিস্থিতি নির্বাচন সামনে রেখে প্রার্থী ও ভোটার সবাইকে আতঙ্কের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।
এদিকে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক, জুলাই যোদ্ধা ও ঢাকা-৮ আসনের সংসদ-সদস্য পদপ্রার্থী শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলাকারী টিমের অন্যতম দুই সদস্য ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর সরব হয়েছে পুলিশ, র্যাব, ডিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সব সংস্থা। অথচ ঘটনার পরপরই রাজধানীর চারদিকে তিন-চার ধাপে ব্লক রেড দিয়ে প্রবেশদ্বারগুলোয় চেকপোস্ট বসালে সন্ত্রাসীরা নির্বিঘ্নে চলে যেত পারত না। এছাড়া সীমান্তে মানব পাচার হওয়া পয়েন্টগুলোয় বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া পাহারা বসানোসহ রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ত করা হলে এভাবে তাদের পালিয়ে যাওয়া সহজ হতো না। কিন্তু নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো যুগান্তরকে জানিয়েছে, এরকম কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়েরও যথেষ্ট অভাব ছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, পুলিশ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হাইকমান্ড থেকে যেভাবে নির্দেশনা দেওয়াসহ অ্যাকশন প্ল্যান নেওয়া দরকার ছিল, সেটি হয়নি। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। আমরা শুধু অফিশিয়াল ভাষায় কথা বলে গেছি। এর ফলে হাদির ওপর হামলাকারীরা তাদের পূর্বপরিকল্পনা মোতাবেক নির্বিঘ্নে সীমান্ত পার হয়ে ভারতে চলে যেতে পেরেছে।
চরম এই ব্যর্থতার দায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অপরাধ বিভাগ ও গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) এবং ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি এড়াতে পারেন না। তাদের চরম ব্যর্থতার কারণে হাদির ওপর হামলাকারীরা ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকা পার হয়ে দেশত্যাগ করেছে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সংক্ষুব্ধ অনেকে যুগান্তরের কাছে এভাবে তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
কেননা রাজধানীতে এ ধরনের চাঞ্চল্যকর অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর দুর্বৃত্তদের ধরতে সবচেয়ে বেশি তৎপর থাকার কথা ছিল ডিএমপির। অথচ ১২ ডিসেম্বর ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনার পর তাৎক্ষণিকভাবে রাজধানীতে অতিরিক্ত চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি করার কোনো দৃশ্য দেখা যায়নি। পুলিশের একটি সূত্র বলছে, তাৎক্ষণিক এ ধরনের কোনো নির্দেশই দেওয়া হয়নি মাঠ পুলিশকে।
এ বিষয়ে জানতে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এসএন মো. নজরুল ইসলাম ও অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলামকে একাধিকবার ফোনে কল করা হলেও তারা রিসিভ করেননি। মোবাইল ফোনে বিষয় উল্লেখ করে খুদেবার্তা পাঠিয়েও কথা বলা সম্ভব হয়নি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতার বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (অপরাধ ও অপস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘আমাদের উচিত ছিল যেভাবে হোক আসামিদের কবজায় আনা। তবে তারাও প্রচণ্ড রকমের ধূর্ত। পালানোর প্রাণপণ চেষ্টা করবে, এটাই স্বাভাবিক। আবার এত বড় জনবহুল একটা শহরে পালিয়ে যাওয়াও কঠিন কিছু না। তবে শেষ পর্যন্ত আমরা তাদের ধরতে পারিনি, এটাই বাস্তবতা।’ তিনি বলেন, র্যাবও ধরার জন্য সব চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারাও পারেনি।
সূত্র: ‘দৈনিক যুগান্তর ‘

















