প্রতিনিধি ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ , ৩:৩৫:৪৪ অনলাইন সংস্করণ
কপোতাক্ষ টাইমস ডেক্স:
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া শক্তিগুলো বুঝে গেছে, তরুণ যোদ্ধারাই তাদের পুনরুত্থানের সবচেয়ে বড় বাধা। তাই নির্বাচন আসার আগেই তারা এসব বাধা সরিয়ে নিজেদের রাজত্ব কায়েম করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। নির্বাচনের আগে সহিংসতা ও চোরাগোপ্তা হামলার মাধ্যমে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে।
গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মহান বিজয় দিবস-২০২৫ উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা এসব কথা বলেন।

আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন এবং গণভোটকে ‘বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথরেখা নির্ধারণের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ হিসেবে বর্ণনা করে ‘ভোট রক্ষা করার, দেশকে রক্ষা করার’ আহ্বান জানান প্রধান উপদেষ্টা। নির্বাচন কমিশন আগামী বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন এবং গণভোটের তারিখ রেখে তপশিল ঘোষণার পর এই প্রথম জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলেন মুহাম্মদ ইউনূস। ভাষণের শুরুতেই দেশের শিশু, কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী, ছাত্রছাত্রী, নারী-পুরুষ, নবীন-প্রবীণ—সবাইকে বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা জানান। মুক্তিযুদ্ধসহ ‘স্বাধীনতার জন্য যুগযুগ ধরে লড়াই-সংগ্রামে যারা আত্মত্যাগ করেছেন’ সেই বীর যোদ্ধা ও শহীদদের অবদান তিনি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
ড. ইউনূস বলেন, ‘জাতীয় নেত্রী, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, গণতান্ত্রিক রাজনীতির অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তিত্ব এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বর্তমানে অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে আছেন। এ বিষয়টি আমাদের সবার জন্যই উদ্বেগের। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার খালেদা জিয়ার অসুস্থতার বিষয়টি শুরু থেকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আসছে। তিনি ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের প্রতি তার অবিচল অঙ্গীকার, দেশের উন্নয়নে তার অবদান এবং তার প্রতি জনগণের শ্রদ্ধাময় আবেগ বিবেচনায় নিয়ে সরকার এরই মধ্যে তাকে রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে তার চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পরিবারের ইচ্ছাকে সম্মান দেখিয়ে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। দেশে চিকিৎসার পাশাপাশি প্রয়োজনে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থাসহ সব বিষয় বিবেচনায় রয়েছে।’
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলার প্রসঙ্গ টেনে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘শরিফ ওসমান হাদির ওপর সম্প্রতি যে হামলার ঘটনা ঘটেছে, তা শুধু একজন ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়—এটি বাংলাদেশের অস্তিত্বের ওপর আঘাত, আমাদের গণতান্ত্রিক পথচলার ওপর আঘাত। শরিফ ওসমান হাদি বর্তমানে সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন। তার চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এরই মধ্যে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়েছে। আপনারা তার জন্য মহান আল্লাহতায়ালার কাছে অন্তরের অন্তস্তল থেকে দোয়া করুন।’ ওসমান হাদিকে গুলি করার ঘটনা সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করা গেছে। আমি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করতে চাই, যারা এই ষড়যন্ত্রে জড়িত, তারা যেখানেই থাকুক না কেন, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, পরাজিত শক্তি ফ্যাসিস্ট টেররিস্টদের এই অপচেষ্টা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ করে দেওয়া হবে। ভয় দেখিয়ে, সন্ত্রাস ঘটিয়ে বা রক্ত ঝরিয়ে এই দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা কেউ থামাতে পারবে না। আপনাদের প্রতি আহ্বান জানাই—সংযম বজায় রাখুন। অপপ্রচার বা গুজবে কান দেবেন না। ফ্যাসিস্ট টেররিস্টরা, যারা অস্থিরতা সৃষ্টি করতে চায়, আমরা অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদের মোকাবিলা করব। তাদের ফাঁদে পা দেব না। পরাজিত ফ্যাসিস্ট শক্তি এ দেশের পবিত্র মাটিতে আর কোনো দিন ফিরে আসবে না। তাদের বন্ধুরা যত দিন তাদের সঙ্গে আছে, তত দিন তারা এই স্বপ্ন দেখবে। নির্বাচন হয়ে গেলে তাদের বন্ধুরা সমর্থন জোগাতে বেকায়দায় পড়বে। সে জন্যই তো এত তাড়াহুড়া। তারা চায়, নির্বাচনের আগেই তাদের ফিরে আসা নিশ্চিত করতে। নানা ভঙ্গিতে এটা তারা করবে। এই চোরাগোপ্তা খুন করার উদ্যোগ এর একটা রূপ। আরও কঠিনতর পরিকল্পনা নিয়ে তাদের প্রস্তুতি আছে।
ড. ইউনূস বলেন, ‘ভোটের ওপর নির্ভর করছে আপনার আমার সবার ভবিষ্যৎ। আপনার আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ। যোগ্য লোককে ভোট দিন। জাতির ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করুন।’ এই নির্বাচনকে সত্যিকার অর্থে ‘উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক, শান্তিপূর্ণ এবং সর্বোপরি সুষ্ঠু করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি জাতির সামনে তুলে ধরেন প্রধান উপদেষ্টা। নির্বাচনের জন্য ‘সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ’ পরিবেশ তৈরি করতে রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা চেয়ে তিনি বলেন, ‘আপনারা একে অপরকে প্রতিযোগী হিসেবে দেখবেন, কখনো শত্রু হিসেবে দেখবেন না।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তিনটি বিষয়কে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে। তা হলো— জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার, একটি জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণের জন্য রাষ্ট্রকাঠামোর প্রয়োজনীয় মৌলিক সংস্কার এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের নির্দেশে সংগঠিত হত্যাকাণ্ডের বিচারকাজ যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় এগিয়ে চলছে। এরই মধ্যে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক একটি মামলার রায় ঘোষিত হয়েছে।

















