বুধবার দুপুরে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও তারেক রহমান স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কমিটির আহ্বায়ক সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘তিনশ ফিটে সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠান হবে। সেখানে তিনি দেশবাসীর প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করবেন এবং মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করবেন। সেই আয়োজনে তিনি ছাড়া দ্বিতীয় কোনো বক্তা থাকছেন না। এরপর তিনি চলে যাবেন এভারকেয়ার হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসাধীন আছেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। সেখান থেকে তারেক রহমান গুলশান অ্যাভিনিউতে ১৯৬ নম্বর বাসায় যাবেন। এই বাসায় তারেক রহমান থাকবেন।’
দ্বিতীয় দিনে কাল শুক্রবার বাদ জুমা শেরেবাংলা নগরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারত এবং সেখান থেকে সড়কপথে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন তারেক রহমান। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘পরদিন শনিবার তারেক রহমান নিজে ভোটার হতে যা করতে হয় সেই কাজগুলো করবেন। এছাড়া সেদিন শরিফ ওসমান হাদির কবর জিয়ারত এবং পঙ্গু হাসপাতালে জুলাই অভ্যুত্থানে আহতদের দেখতে যাবেন।’ অভ্যর্থনার প্রয়োজনে রাজধানীতে বিভিন্ন পয়েন্টে অভ্যর্থনাকেন্দ্র, যানবাহন পার্কিংয়ের নির্ধারিত স্থান, মেডিকেল ক্যাম্প, ফিল্ড হাসপাতাল সম্পর্কে তথ্য তুলে ধরেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য। একই সঙ্গে আজ জনসাধারণের সৃষ্ট অসুবিধা ও কষ্টের জন্য অগ্রিম দুঃখ প্রকাশও করেন তিনি। এদিকে সিলেট বিমানবন্দরে ভিড় না করার জন্য জেলা ও মহানগর নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন অভ্যর্থনা কমিটির সদস্য সচিব ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কমিটির সদস্য অধ্যাপক মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল উপস্থিত ছিলেন।
বিশ্বরাজনীতিতে নির্বাসন বা দীর্ঘ সময় বিদেশে থাকা রাজনৈতিক নেতাদের প্রত্যাবর্তন বহু ক্ষেত্রে সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে। এসব সফল প্রত্যাবর্তনের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সঠিক কৌশল, সংগঠন ও সময় উপযোগী সিদ্ধান্ত থাকলে বিদেশ থেকে ফেরা নেতৃত্বকে নতুন উচ্চতায় নেওয়া সম্ভব। বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রত্যাবর্তনের মধ্যে কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন-শক্ত দলীয় কাঠামো, স্পষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য, জনসমর্থন ধরে রাখার সক্ষমতা এবং পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর কৌশল অন্যতম। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাজনীতিতেও তারেক রহমানের দেশে ফেরাকে বাঁকবদলের সূচনালগ্ন হিসাবে দেখা হচ্ছে। বিদেশে দীর্ঘ সময় অবস্থানের পর তার প্রত্যাবর্তন শুধু বিএনপির নয়, দেশীয় সমসাময়িক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে আমূল পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করছেন পর্যক্ষেকরা। তার উপস্থিতি সংগঠন হিসাবে বিএনপিকে চাঙা করার পাশাপাশি, মাঠপর্যায়ের নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয় এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, তারেক রহমানের এই দীর্ঘ অনুপস্থিতিকালে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল অত্যন্ত বন্ধুর এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন। ক্ষমতার লালসায় কিংবা রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের নজিরবিহীন ভয়ভীতিতে দলের বহু নেতাকর্মীকে বিচ্যুত করার অপচেষ্টা হয়েছে বারবার। বিএনপিকে ভেঙে ফেলার জন্য নানামুখী ষড়যন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিভাজন সৃষ্টির চেষ্টা চলেছে প্রতিটি স্তরে। কিন্তু সেই চরম দুর্দিনেও দলের ঐক্য যে অটুট ছিল এবং কোনো বড় ধরনের ফাটল ধরেনি, সেটির একমাত্র কৃতিত্ব বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সুযোগ্য, বিচক্ষণ এবং ধৈর্যশীল নেতৃত্বের।
তিনি বলেন, তারেক রহমান শুধু নিজের দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখেননি, বরং দেশের গণতন্ত্রকামী অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝেও এক অনন্য ঐক্যের সেতু নির্মাণ করেছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি একটি বিরল ঘটনা যে, দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থেকেও একজন নেতা কেবল ভিডিও কনফারেন্স এবং সাংগঠনিক যোগাযোগের মাধ্যমে একটি বিশাল রাজনৈতিক জোটকে অভিন্ন লক্ষ্যে স্থির রাখতে পেরেছেন। তিনি হয়ে উঠেছিলেন ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের এক অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী সুতো, যা সব মতের মানুষকে একই প্ল্যাটফর্মে গেঁথে রেখেছিল। তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবন অনেকটা নিজের বয়সের সমান। মাত্র ছয় বছর বয়সে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ পরিবারের অন্যতম ঘটনা। জিয়াউর রহমান রণাঙ্গনে থাকার সময়ে আরাফাত রহমানকে নিয়ে মা খালেদা জিয়ার সঙ্গে কারাবন্দি হতে হয় তারেক রহমানকেও। পিতা জিয়াউর রহমান যখন রাষ্ট্রপতি তখনো ঘরের কিশোর ছেলে তারেক রহমান।
মাত্র ২২ বছর বয়সে ১৯৮৮ সালে বগুড়া জেলার গাবতলী থানা বিএনপির সদস্য হওয়ার মধ্য দিয়ে তারেক রহমান রাজনীতিতে পদার্পণ করেন। এরপর দীর্ঘ ৩৮ বছর নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজ একজন পরিপক্ব নেতায় পরিণত হয়েছেন তিনি। ওয়ান-ইলেভেনের সরকার এমন কোনো অত্যাচার-নির্যাতন নেই যা তার ওপর দিয়ে যায়নি। ২০০৭ সালে রিমান্ডে গুরুতর অসুস্থ হয়ে ৩ সেপ্টেম্বর মুক্তি পেলেও ঘরে ফেরা হয়নি তার। হাসপাতাল থেকেই ১১ সেপ্টেম্বর চলে যেতে হয় যুক্তরাজ্যের লন্ডনে। ২০০৯ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে এবং ২০১৬ সালে ৬ষ্ঠ কাউন্সিলে তারেক রহমান দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে জিয়া পরিবারের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন নেমে আসে। ওই সময় খালেদা জিয়াকে তার স্মৃতিবিজড়িত শহীদ মইনুল রোডের বাসা থেকে গায়ের জোরে উচ্ছেদ করা হয়। মিথ্যা মামলায় তাকে কারাগারেও নেওয়া হয়েছিল।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বলেন, ‘যেই ঘরে আমাদের দুই ভাইয়ের সন্তানরা জন্মগ্রহণ করেছিল, যেই ঘরে আমার মায়ের বহু স্মৃতি ছিল, সেই স্মৃতিগুলোকে ভেঙেচুরে ধুলায় মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। যে ভাইকে আমি রেখে এসেছিলাম সেই ভাই এখন আর নেই। যেই সুস্থ মাকে রেখে এসেছিলাম, সেই সুস্থ মাও এখন সুস্থ নেই। এ রকম কাহিনি বাংলাদেশের শত নয়, হাজার হাজার পরিবারের।’ নেতাকর্মীদের দাবি, ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের শুরু থেকে শেষ, পুরোটা সময় নেপথ্যের দারুণ এক কুশীলব ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। কর্মীদের সংগঠিত ও উজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে নিখুঁত কৌশলী ভূমিকা নেন তিনি। একদিকে সরকার পতনের আন্দোলনে তীক্ষ্ণ নজর, অন্যদিকে রাষ্ট্র মেরামতের সংস্কার ভাবনা; দুটিই সমানভাবে এগিয়ে নিয়েছেন তিনি। অন্তর্বর্তী সরকারকে সহযোগিতার পাশাপাশি রাজনৈতিক সরকারে গুরুত্ব দিয়ে নির্বাচনের তাগিদও দিয়েছেন তারেক রহমান। বিভিন্ন সভা-সেমিনারে তিনি বলেন, ‘একজন মায়ের চোখে যেমন বাংলাদেশ, তেমন একটি বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলতে চাই। নবীন ও প্রবীণ সবাই মিলে দেশ গড়তে চাই। চাই তারুণ্যের প্রথম ভোট ধানের শীষের জন্য হোক।’
সব জল্পনা-কল্পনা, শঙ্কা আর উৎকণ্ঠার অবসান ঘটতে যাচ্ছে আজ। নিজেদের অনুপ্রাণিত মনে করছেন কর্মীরা। তারা বলছেন, আজ জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমিক রাজনীতিকের অনন্য এক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। নেতারা বলেন, বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বিষয়ে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের যোগ্য উত্তরসূরি জিয়া পরিবার। তারেক রহমান এই দর্শনকে ধারণ করেই এগিয়ে চলছেন। যারা নিন্দুক, অকারণে সমালোচনা করেছেন আগামী দিনে তারও অবসান ঘটবে বলে তারা মনে করেন। বিএনপির বাইরে দেশের আপামর মানুষের কাছেও তারেক রহমান আজ সবচেয়ে বড় বিকল্প। দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর আওয়ামী সরকারের রোষানলে থেকে দীর্ঘদিন তিনি নির্বাসিত ছিলেন। তার অপেক্ষায় আগামীর বাংলাদেশ। বিএনপির মধ্যে আলোচনা হলো; নেতা তারেক রহমান তাদের শিখিয়েছেন, স্বপ্ন দেখিয়েছেন। শুধু স্বপ্ন দেখাননি, স্বপ্ন বাস্তবায়নের উপায়ও দেখিয়েছেন। দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় জাতীয়তাবাদী ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামের যে নেতা তারেক রহমান, ইতোমধ্যে তিনি নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছেন বলে তারা মনে করেন। তাই বাংলাদেশে নতুন জোয়ারের সৃষ্টি হবে এমন প্রত্যাশা তাদের। তাদের মতে, সেই জোয়ারে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ উচ্ছ্বসিত হবে। এই পলিমাটির সৌরভ গায়ে মেখে তারেক রহমান নামছেন এক কঠিন পরীক্ষায়। তার প্রত্যাবর্তনকে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসাবেই দেখছেন অনুসারীরা।
সূত্র : “দৈনিক যুগান্তর”